শেখ ফারুক হোসেন, সাতক্ষীরা জেলা নিজস্ব প্রতিনিধি:
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিকর্ম, জীবনাদর্শ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে ‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) সকাল ১০টায় কালিগঞ্জ উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে এ প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করা হয়। উপজেলা প্রশাসন, কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরার আয়োজনে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় উপজেলার বিভিন্ন প্রাথমিক, কারিগরি ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা শাকিল আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করেন উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তা হেমন্দ্রনাথ মণ্ডল। প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাইনুল ইসলাম খান।
বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব ডা. শফিকুল ইসলাম বাবু, কালিগঞ্জ মহাবিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক গাজী আজিজুর রহমান, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দিলীপ কুমার বিশ্বাস, সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা তৌকির আহমেদ, কালিগঞ্জ সদর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলামিন, প্রমুখ।
এ ছাড়া বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষিকা, সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
নজরুলের জীবন ও সাহিত্য
কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ সালের ২৫ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাকনাম ছিল ‘দুখু মিয়া’। শৈশবেই দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বেড়ে ওঠা নজরুল পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহ, সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন।
কৈশোরে তিনি লেটো গানের দলে যুক্ত হন এবং সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি গান ও অভিনয়ের সঙ্গে পরিচিত হন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সেনাজীবন শেষে কলকাতায় ফিরে সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় সক্রিয় হন।
১৯২২ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’ তাঁকে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র পরিচিতি এনে দেয়। একই বছর তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা। ব্রিটিশবিরোধী লেখালেখির কারণে তিনি কারাবরণ করেন। কারাগারে থাকাকালে তাঁর প্রতিবাদী সাহিত্য আরও ব্যাপকভাবে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
নজরুল শুধু বিদ্রোহের কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন প্রেম, মানবতা ও সাম্যের কবি। তাঁর কবিতা ও গানে ধর্মীয় সম্প্রীতি, মানুষের মর্যাদা এবং শোষণ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কথা উঠে এসেছে। হিন্দু-মুসলিম উভয় ধর্মের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি তাঁর সাহিত্য ও সংগীতে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
১৯৪২ সালে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে বাক্শক্তি ও স্মৃতিশক্তি হারান। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসে এবং তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। একই বছর তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়।
কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
নজরুলের আদর্শ ধারণের আহ্বান
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন সাম্য, মানবতা, স্বাধীনতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার কবি। তাঁর সাহিত্য অন্যায়, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মানুষকে সোচ্চার হতে অনুপ্রাণিত করেছে। পাশাপাশি তাঁর সৃষ্টিতে মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সাম্য ও সম্প্রীতির বার্তা রয়েছে।
বক্তারা বলেন, নতুন প্রজন্মের কাছে নজরুলের জীবন ও সাহিত্য তুলে ধরতে সাংস্কৃতিক চর্চার বিকল্প নেই। এ ধরনের আয়োজন শিক্ষার্থীদের মেধা ও সৃজনশীলতা বিকাশের পাশাপাশি দেশপ্রেম, মানবিক মূল্যবোধ ও সম্প্রীতির চেতনা জাগ্রত করতে ভূমিকা রাখবে।
নজরুলের জীবনাদর্শ ধারণ করে বৈষম্যহীন, মানবিক ও সম্প্রীতিময় সমাজ গঠনে তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান বক্তারা।