
সাতক্ষীরা জেলা, প্রতিনিধি:
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলা ও আশপাশের এলাকায় সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা, ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, চক্রটি মাদক ব্যবসা, সীমান্ত চোরাচালান, ব্ল্যাকমেইল, চাঁদাবাজি, অবৈধ প্রভাব বিস্তার এবং ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, চক্রটির অন্যতম নেতৃত্বে রয়েছেন কালিগঞ্জ উপজেলার চম্পাফুল ইউনিয়নের মশরকাটি গ্রামের মৃত এলাহী বক্স গাজীর জ্যেষ্ঠ ছেলে মো. হাফিজুর রহমান, যিনি ‘টেমি হাফিজ’ নামে পরিচিত। বর্তমানে তিনি কালিগঞ্জ বাজারগ্রাম এলাকায় বসবাস করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি কখনো রাজনৈতিক পরিচয়, কখনো সাংবাদিক, আবার কখনো বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য পরিচয় দিয়ে সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ সদস্য, শিক্ষক, ঠিকাদার ও ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার এবং অর্থ আদায়ের চেষ্টা করতেন।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, একাধিক মামলার আসামি টেমি হাফিজ বিভিন্ন চোরাচালানকারী, ডাকাতি মামলার আসামি, অস্ত্র ও মাদক মামলার আসামি এবং সীমান্ত চোরাচালানকারী চক্রকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে আসছেন। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ব্ল্যাকমেইল, ভূমি-সংক্রান্ত দালালি, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক কারবারে সহযোগিতা এবং সংঘবদ্ধ ডাকাতি চক্রকে সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, এসব কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ মানুষ ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তথ্য সরবরাহকারী ব্যক্তিরাও নানাভাবে হুমকি, মারধর সিকার, মিথ্যা মামলা সহ বিভিন্ন ভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, টেমি হাফিজের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে এমন কয়েকজন ব্যক্তিরা হলো
সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণনগর এলাকার মৃত বরকত উল্লাহ গাজীর ছেলে মো. রেজাউল করিমকে আন্তঃজেলা ডাকাত চক্রের সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে খুন, ডাকাতি, দস্যুতা, চুরি ও মাদকসহ মোট ৩০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সাতক্ষীরা সদর থানার একটি ডাকাতি মামলার লুণ্ঠিত স্বর্ণালঙ্কার-একটি গলার হার ও এক জোড়া বালা-তার বাড়ির রান্নাঘরের মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়। এছাড়া নগদ অর্থ, বিদেশি মুদ্রা, একাধিক মোবাইল ফোন এবং স্বর্ণ-রূপার বিভিন্ন গহনাও জব্দ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
কালিগঞ্জ উপজেলার শংকরপুর গ্রামের বাসিন্দা ইয়ার আলীর বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও মাদক-সংক্রান্ত ২৬টি মামলার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তিনি সংঘবদ্ধ ডাকাত দলের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি বিশেষ অভিযানে তাকে একটি ৯ এমএম পিস্তল, চার রাউন্ড গুলি, দুটি ওয়াকিটকি ও মাদকসহ গ্রেপ্তার করা হয়।
শ্যামনগর উপজেলার চন্দিপুর এলাকার আবু বক্কর গাজীর মেয়ে ও চোর ছুবাহানের স্ত্রী মাসুরা বেগম (৩২)-এর বিরুদ্ধে অজ্ঞান পার্টি, চুরি, ডাকাতি, ব্ল্যাকমেইল ও মাদক-সংক্রান্ত পাঁচটি মামলার অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। অভিযোগ রয়েছে, তিনি জেলা শ্রমিক লীগ ও মানবাধিকার কর্মীর ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করতেন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, কালিগঞ্জ উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রামের একটি স্বর্ণ ডাকাতির ঘটনায় লুণ্ঠিত স্বর্ণালঙ্কার বিক্রির সময় সাতক্ষীরা সদর এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
শংকরপুর গ্রামের বাসিন্দা বাহার আলী তরফদারের বিরুদ্ধে ডাকাতি, অস্ত্র, হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের অন্তত ৩০টি মামলা রয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর সম্প্রতি যৌথ অভিযানে ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি হিসেবে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
কৃষ্ণনগর এলাকার রফিকুলের বিরুদ্ধে সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধ অস্ত্র ও মাদক সরবরাহ এবং আন্তঃবিভাগীয় ডাকাতির অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখনই চক্রটির কোনো সদস্যকে গ্রেপ্তার করে, তখন টেমি হাফিজ তার পরিচালিত কথিত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে প্রশাসনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালান।
অভিযোগ রয়েছে, সম্প্রতি সাতক্ষীরার সাবেক পুলিশ সুপার, কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ওসির বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা ও মানহানিকর বক্তব্য প্রচার করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, এর মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কেউ মাদক, ডাকাতি বা অন্য কোনো অপরাধের তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দিলে তাকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, মারধর কিংবা মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করা হয়। নিরাপত্তার অভাবে অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পান না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিভিন্ন অপরাধমূলক ঘটনায় আদালতে দেওয়া কয়েকজন আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতেও এই চক্রের কয়েকজন সদস্যের নাম এসেছে। তবে এসব বিষয়ে আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
এলাকার সচেতন নাগরিক ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কথিত সাংবাদিকতা ও ভুয়া পরিচয়ের আড়ালে পরিচালিত এই সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের কারণে সীমান্তবর্তী এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে।
তাদের দাবি, পুলিশ সুপার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইজিপি এবং সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
অভিযুক্ত মো. হাফিজুর রহমান (ওরফে ‘টেমি হাফিজ’)-এর বক্তব্য জানতে তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।