
সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি:
হত্যা, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, জমি দখল, অস্ত্র ও মাদকসহ বিভিন্ন মামলার বিচারাধীন আসামিদের জামিন বাতিল, মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি এবং আদালতের রায়ের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের দাবিতে সাতক্ষীরায় মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সাতক্ষীরা জেলা ও দায়রা জজ আদালত চত্বরে ‘কালিগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের সর্বস্তরের জনগণ’-এর ব্যানারে এ মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। কর্মসূচিতে কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত নারী-পুরুষ অংশ নেন।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, কালিগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন হত্যা মামলার আসামি ইয়ার আলী, বাহার আলী ও তাদের ভগ্নিপতি রেজাউলের বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, জমি দখল, অস্ত্র ও মাদকসহ বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। দীর্ঘদিনেও মামলাগুলোর বিচারকাজ শেষ না হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসী নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন বলে তারা দাবি করেন।
বক্তারা আরও অভিযোগ করেন, ইয়ার আলী, বাহার আলী ও রেজাউল ইউপি চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন হত্যা, দেবহাটা উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা সুভাস ঘোষের বাড়িতে ডাকাতি, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার যোগরাজপুর গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোস্তফা আবুল কালামের বাড়িতে ডাকাতি, কৃষ্ণনগর, সোতা ও বেনাদনা এলাকায় চাঁদাবাজি, মুকুন্দমধুসুধনপুর চৌমুহনী এলাকায় বিকাশ এজেন্টকে কুপিয়ে আহত করে তিন লক্ষাধিক টাকা ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।
তাদের দাবি, অপরাধী চক্রটি এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে আগ্নেয়াস্ত্র, পিস্তল ও ওয়াকিটকি ব্যবহার করত। সম্প্রতি র্যাবের অভিযানে অস্ত্রসহ ইয়ার আলী গ্রেপ্তার হন। একই সময়ে তাদের সহযোগী আনিছসহ দুজন অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হওয়ার পর রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলেও মানববন্ধনে উল্লেখ করা হয়।
মানববন্ধনে বক্তাদের দাবি অনুযায়ী, ইয়ার আলীর বিরুদ্ধে ৩৫টি, বাহার আলীর বিরুদ্ধে ৩১টি এবং রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে ৪১টি মামলা রয়েছে।
বক্তারা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে বিচারকাজ চললেও মামলাগুলোর নিষ্পত্তি না হওয়ায় ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের ভাষ্য, জামিনে মুক্ত হয়ে আসামিরা পুনরায় চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, হত্যা ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। জামিনে মুক্ত হতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে উল্লেখ করে তারা নতুন করে চাঁদাবাজির মাত্রা বাড়িয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
মানববন্ধন থেকে ইয়ার আলী, বাহার আলী ও রেজাউলের জামিন বাতিল, বিচারাধীন মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি, বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার এবং আদালতের রায়ের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
এদিকে একই দিনে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতসহ জেলা শহর ও কালিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অভিযুক্তদের ছবি ও মামলার তথ্যসংবলিত পোস্টার সাঁটানো হয়। পোস্টারে ‘বিচার চাই, ফাঁসি চাই’ শিরোনামে ইয়ার আলী, বাহার আলী ও রেজাউলের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা উল্লেখ করে দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানানো হয়।
পোস্টারে আরও দাবি করা হয়, কালিগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণনগর এলাকার মৃত বরকত উল্লাহ গাজীর ছেলে রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি, দস্যুতা, চুরি ও মাদকসহ প্রায় ৪১টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। সর্বশেষ গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ডাকাতির ঘটনায় লুণ্ঠিত স্বর্ণালঙ্কার, নগদ অর্থ, বিদেশি মুদ্রা ও একাধিক মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
এছাড়া শংকরপুর গ্রামের ইয়ার আলীর বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও মাদকসহ ৩৫টি মামলার অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি একটি ৯ এমএম পিস্তল, চার রাউন্ড গুলি, দুটি ওয়াকিটকি ও মাদকসহ তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও পোস্টারে উল্লেখ করা হয়।
একইভাবে বাহার আলী তরফদারের বিরুদ্ধে ডাকাতি, অস্ত্র, হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে অন্তত ৩১টি মামলা রয়েছে বলে দাবি করা হয়। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর যৌথ অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলেও উল্লেখ করা হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা আরও দাবি করেন, মাসুরা বেগমের বিরুদ্ধে অজ্ঞান পার্টি, চুরি, ব্ল্যাকমেইল ও মাদকসংক্রান্ত পাঁচটি মামলা রয়েছে। শ্রীরামপুর এলাকার একটি স্বর্ণ ডাকাতির ঘটনায় লুণ্ঠিত মালামাল বিক্রির সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলেও তারা অভিযোগ করেন।
এছাড়া মো. হাফিজুর রহমান ওরফে ‘টেমি হাফিজ’কে এই চক্রের অন্যতম সমন্বয়কারী দাবি করে বক্তারা বলেন, তিনি নিজেকে সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য পরিচয় দিয়ে অপরাধীদের সহযোগিতা এবং সাধারণ মানুষকে ব্ল্যাকমেইল করতেন। একই সঙ্গে ‘রাজগুল’, ‘আনিসুর’ ও ‘পলাশ’ নামে আরও তিনজনকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়। বক্তাদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর প্রচারণাও চালানো হয়েছে।
মানববন্ধনের শেষে বক্তারা মোশারফ হোসেন হত্যা মামলার দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে রায় কার্যকর, বিচারাধীন অন্যান্য মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং কালিগঞ্জসহ পুরো এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।